১০৩টি ছররা বুলেট শরীরে নিয়ে বেঁচে থাকার এক অবিশ্বাস্য গল্প
মোঃ কামরুজ্জামান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :
১০ আগস্ট, ২০২৬, 8:55 PM
১০৩টি ছররা বুলেট শরীরে নিয়ে বেঁচে থাকার এক অবিশ্বাস্য গল্প
দিনটি ছিল ১৮ জুলাই ২০২৪। কুষ্টিয়ার রাজপথ সেদিন স্লোগানে কাঁপছিল; বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর মানুষের চোখে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন। সেই উত্তাল জনস্রোতে ছিলেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানতেন না। জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজপথ তাঁকে দাঁড় করাবে জীবন-মৃত্যুর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সামনে। সেদিনের সেই মুহূর্ত শুধু একটি মিছিলে অংশ নেওয়ার ঘটনা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ১০৩টি ছররা বুলেট, রক্ত, যন্ত্রণা আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য গল্প।
১৮ জুলাই সকাল ১০টার আগেই কুষ্টিয়া শহরের আন্দোলনকারীদের মূল জমায়েত শুরু হয় এবং কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের গেট থেকে বের হওয়া মিছিলটি শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরহাস পর্যন্ত যায়। দুপুরের দিকে কিছু সময়ের জন্য খাবার খেতে বাসায় ফিরেছিলেন আশরাফুল। কিন্তু উত্তাল রাজপথের ডাক যেন তাঁকে আবার টেনে নিচ্ছিল। ছোট ভাই ইমন ও বন্ধু সাদ্দামকে সঙ্গে নিয়ে তিনজন আবারও যোগ দেন মিছিলে। ততক্ষণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
প্রধান সড়কে পুলিশ ও প্রশাসনের কড়া টহলের কারণে গ্রেপ্তার এড়াতে আশরাফুল ও তার সঙ্গীরা শহরের ভেতরের গলি ধরে এগোতে থাকেন। পরবর্তীতে হেঁটে মূল সড়কের দিকে গিয়ে দেখা যায় চারপাশে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া, রাবার বুলেট ও ছররা গুলির শব্দ। সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত শরীর দেখে স্থির থাকতে না পেরে আশরাফুল একটি লাঠি ও কয়েকটি ইট হাতে নিয়ে কলকাকলি স্কুলের সীমানা দেয়ালের পাশে অন্যদের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই প্রতিরোধের মাশুল দিতে হয় নিজের রক্ত দিয়ে।
হঠাৎ একটি সাদা রঙের পুলিশ ভ্যান দ্রুত তাঁদের কাছাকাছি চলে আসে। বিপদ বুঝে পেছনে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি; মুহূর্তেই গর্জে ওঠে বন্দুক। ঝাঁকে ঝাঁকে ছররা গুলি এসে বিদ্ধ করে আশরাফুলের পিঠ, ঘাড় ও বুক। গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আতঙ্কের মধ্যেও একজন অপরিচিত মানুষ ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন। এরপর সাধারণ মানুষের সহায়তায় রক্তাক্ত আশরাফুলকে দ্রুত একটি রিকশায় তুলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর তথ্য—আশরাফুলের শরীরে বিঁধে রয়েছে প্রায় ১০৩টি ছররা বুলেট!
১৮ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনের পর সময় গড়ালেও আশরাফুলের শরীর থেকে সেই ক্ষত মুছে যায়নি। শরীরে থাকা ১০৩টি ছররা বুলেট তাঁকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় সেই ভয়াবহ দিনের কথা। ১০৩টি ছররা বুলেট তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করলেও বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে পরাজিত করতে পারেনি। একটি বৈষম্যহীন, মুক্ত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আজও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন সেদিনের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন।
মোঃ কামরুজ্জামান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :
১০ আগস্ট, ২০২৬, 8:55 PM
দিনটি ছিল ১৮ জুলাই ২০২৪। কুষ্টিয়ার রাজপথ সেদিন স্লোগানে কাঁপছিল; বাতাসে বারুদের গন্ধ, আর মানুষের চোখে ছিল পরিবর্তনের স্বপ্ন। সেই উত্তাল জনস্রোতে ছিলেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানতেন না। জানতেন না, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজপথ তাঁকে দাঁড় করাবে জীবন-মৃত্যুর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সামনে। সেদিনের সেই মুহূর্ত শুধু একটি মিছিলে অংশ নেওয়ার ঘটনা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ১০৩টি ছররা বুলেট, রক্ত, যন্ত্রণা আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য গল্প।
১৮ জুলাই সকাল ১০টার আগেই কুষ্টিয়া শহরের আন্দোলনকারীদের মূল জমায়েত শুরু হয় এবং কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের গেট থেকে বের হওয়া মিছিলটি শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌরহাস পর্যন্ত যায়। দুপুরের দিকে কিছু সময়ের জন্য খাবার খেতে বাসায় ফিরেছিলেন আশরাফুল। কিন্তু উত্তাল রাজপথের ডাক যেন তাঁকে আবার টেনে নিচ্ছিল। ছোট ভাই ইমন ও বন্ধু সাদ্দামকে সঙ্গে নিয়ে তিনজন আবারও যোগ দেন মিছিলে। ততক্ষণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
প্রধান সড়কে পুলিশ ও প্রশাসনের কড়া টহলের কারণে গ্রেপ্তার এড়াতে আশরাফুল ও তার সঙ্গীরা শহরের ভেতরের গলি ধরে এগোতে থাকেন। পরবর্তীতে হেঁটে মূল সড়কের দিকে গিয়ে দেখা যায় চারপাশে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া, রাবার বুলেট ও ছররা গুলির শব্দ। সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত শরীর দেখে স্থির থাকতে না পেরে আশরাফুল একটি লাঠি ও কয়েকটি ইট হাতে নিয়ে কলকাকলি স্কুলের সীমানা দেয়ালের পাশে অন্যদের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই প্রতিরোধের মাশুল দিতে হয় নিজের রক্ত দিয়ে।
হঠাৎ একটি সাদা রঙের পুলিশ ভ্যান দ্রুত তাঁদের কাছাকাছি চলে আসে। বিপদ বুঝে পেছনে দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হয়নি; মুহূর্তেই গর্জে ওঠে বন্দুক। ঝাঁকে ঝাঁকে ছররা গুলি এসে বিদ্ধ করে আশরাফুলের পিঠ, ঘাড় ও বুক। গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আতঙ্কের মধ্যেও একজন অপরিচিত মানুষ ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন। এরপর সাধারণ মানুষের সহায়তায় রক্তাক্ত আশরাফুলকে দ্রুত একটি রিকশায় তুলে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর তথ্য—আশরাফুলের শরীরে বিঁধে রয়েছে প্রায় ১০৩টি ছররা বুলেট!
১৮ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনের পর সময় গড়ালেও আশরাফুলের শরীর থেকে সেই ক্ষত মুছে যায়নি। শরীরে থাকা ১০৩টি ছররা বুলেট তাঁকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় সেই ভয়াবহ দিনের কথা। ১০৩টি ছররা বুলেট তাঁর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করলেও বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে পরাজিত করতে পারেনি। একটি বৈষম্যহীন, মুক্ত ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আজও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন সেদিনের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন।