বর্তমান সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ: ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
নিজস্ব প্রতিবেদক :
০১ আগস্ট, ২০২৬, 7:32 PM
বর্তমান সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে দেশের ১৮ কোটি মানুষ: ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
বর্তমান সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। মানুষ চায় সংসদ সদস্যরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করুক। সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, এই সংসদের অধিকাংশ সদস্যই অতীতে ফাঁসির মঞ্চ, গুম, আয়নাঘর, নির্যাতন, নির্বাসন কিংবা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। যে কারণে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও ব্যতিক্রমধর্মী একটি সংসদ।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আপনারা জেনে থাকবেন, বর্তমান সংসদের প্রত্যেক দিনের প্রতিটি কার্যক্রম গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেখেন। অর্থাৎ এই সংসদ ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ এই সংসদের ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মানুষের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করবেন—সেটাই স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার হিসেবে আমরা প্রত্যাশা করি।”
তিনি আরও বলেন, সংসদে তাঁদের ভূমিকা সর্বদাই ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা। নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারই ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে প্রণিধানযোগ্য। যতদিন এই সংসদ পরিচালনার সুযোগ থাকবে, ততদিন তিনি তাঁর ন্যায়পরায়ণতা এবং সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট থাকবেন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য সরকার এবং বিরোধী দল—প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। তাঁরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের জন্য এবং সাম্য, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। তাই এখন বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয়ই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে—সেটাই জাতি প্রত্যাশা করছে।
তিনি বলেন, দেশের সকল বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ। যেকোনো রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ থাকে—বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ। আইন বিভাগ থেকে আইন পাস হয়, নির্বাহী বিভাগ সে আইন প্রয়োগ করে এবং আইনের দুর্বলতা বা খুঁটিনাটি বিষয় স্ক্রুটিনাইজ করে বিচার বিভাগ। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আমি মনে করি বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। এখানে সরকারি দল তাঁদের কথা বলার যেমন সুযোগ পাচ্ছেন, ঠিক তেমনিভাবে বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনা করার অবারিত সুযোগ পাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে দুটি পক্ষ থাকবে—এক পক্ষ আরেক পক্ষের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। এ থেকে রাষ্ট্র উপকৃত হবে, জনগণ উপকৃত হবে। যদি ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্র (হাউস অব কমন্স), অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট, কানাডিয়ান পার্লামেন্ট, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট কিংবা ইন্ডিয়ান পার্লামেন্টের কথা বিবেচনা করা হয়, তবে দেখা যায় সেখানে প্রত্যেকটি বিষয় আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারিত হয়।
জাতীয় সংসদ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হবে। সর্বোপরি এ দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দেশ গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যই দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবাধিকার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদাকে সামনে রেখেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন হওয়ার পর দেশের জনগণ প্রতারিত হয় এবং দেশে একদলীয় বাকশাল কায়েম হয়। এই মহান সংসদেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এক মিনিটের ব্যবধানে একটি আইন পাস করে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। যে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি হয়েছিল, স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার সর্বপ্রথম সেই গণতন্ত্রকে হত্যা করে।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান এবং তিনি দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেন। এই গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সর্বপ্রথম মানুষ তাঁদের গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধাগুলো পায় এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সংসদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসদ ছিল ১৯৭৯ সালের সংসদ। পরবর্তী সময়ে দুঃখজনকভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলাদেশ একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় চলে যায় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। আবারও সেই বিএনপির নেতৃত্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করে, শহীদ জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময়ে এরশাদ আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় ক্ষমতায় ছিল। এরশাদের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, সেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক দল নয়—কবি-সাহিত্যিক, পেশাজীবী মানুষ, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিকসহ সমাজের সচেতন সকল মানুষ প্রত্যাশা করেছিল দেশে গণতন্ত্র স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে আবারও নস্যাৎ করা হয়।
তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবোধক। তারপর নবম জাতীয় সংসদে দুঃখজনকভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট রেজিমের সময় ২০১৪ সালের নির্বাচন একতরফাভাবে হয়, যেখানে ১৫২ বা ১৫৩ জন ব্যক্তিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। ২০১৮ সালে রাতের ভোটে নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে ‘আমি এবং ডামি’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, ছাত্র-জনতা ও আপামর জনসাধারণের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, শত শত প্রাণের বিনিময়ে ও হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়ার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আবার নতুন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রাণান্তকর চেষ্টায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
তিনি বলেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল। এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এবং সেই অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ।
নিজস্ব প্রতিবেদক :
০১ আগস্ট, ২০২৬, 7:32 PM
বর্তমান সংসদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। মানুষ চায় সংসদ সদস্যরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনগণের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করুক। সম্প্রতি দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, এই সংসদের অধিকাংশ সদস্যই অতীতে ফাঁসির মঞ্চ, গুম, আয়নাঘর, নির্যাতন, নির্বাসন কিংবা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। যে কারণে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও ব্যতিক্রমধর্মী একটি সংসদ।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আপনারা জেনে থাকবেন, বর্তমান সংসদের প্রত্যেক দিনের প্রতিটি কার্যক্রম গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেখেন। অর্থাৎ এই সংসদ ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি চোখ এই সংসদের ওপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মানুষের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করবেন—সেটাই স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার হিসেবে আমরা প্রত্যাশা করি।”
তিনি আরও বলেন, সংসদে তাঁদের ভূমিকা সর্বদাই ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা। নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারই ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে প্রণিধানযোগ্য। যতদিন এই সংসদ পরিচালনার সুযোগ থাকবে, ততদিন তিনি তাঁর ন্যায়পরায়ণতা এবং সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট থাকবেন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য সরকার এবং বিরোধী দল—প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজেদের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। তাঁরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের জন্য এবং সাম্য, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। তাই এখন বর্তমান সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয়ই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে—সেটাই জাতি প্রত্যাশা করছে।
তিনি বলেন, দেশের সকল বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ। যেকোনো রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ থাকে—বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ। আইন বিভাগ থেকে আইন পাস হয়, নির্বাহী বিভাগ সে আইন প্রয়োগ করে এবং আইনের দুর্বলতা বা খুঁটিনাটি বিষয় স্ক্রুটিনাইজ করে বিচার বিভাগ। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আমি মনে করি বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। এখানে সরকারি দল তাঁদের কথা বলার যেমন সুযোগ পাচ্ছেন, ঠিক তেমনিভাবে বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনা করার অবারিত সুযোগ পাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে দুটি পক্ষ থাকবে—এক পক্ষ আরেক পক্ষের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। এ থেকে রাষ্ট্র উপকৃত হবে, জনগণ উপকৃত হবে। যদি ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্র (হাউস অব কমন্স), অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট, কানাডিয়ান পার্লামেন্ট, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট কিংবা ইন্ডিয়ান পার্লামেন্টের কথা বিবেচনা করা হয়, তবে দেখা যায় সেখানে প্রত্যেকটি বিষয় আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষিতেই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারিত হয়।
জাতীয় সংসদ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হবে। সর্বোপরি এ দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার দেশ গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা, সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যই দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানবাধিকার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদাকে সামনে রেখেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন হওয়ার পর দেশের জনগণ প্রতারিত হয় এবং দেশে একদলীয় বাকশাল কায়েম হয়। এই মহান সংসদেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি এক মিনিটের ব্যবধানে একটি আইন পাস করে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। যে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, মা-বোনদের সম্ভ্রমহানি হয়েছিল, স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার সর্বপ্রথম সেই গণতন্ত্রকে হত্যা করে।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান এবং তিনি দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেন। এই গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সর্বপ্রথম মানুষ তাঁদের গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধাগুলো পায় এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ লাভ করে। পরবর্তী সময়ে সংসদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসদ ছিল ১৯৭৯ সালের সংসদ। পরবর্তী সময়ে দুঃখজনকভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলাদেশ একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় চলে যায় হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। আবারও সেই বিএনপির নেতৃত্বে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করে, শহীদ জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময়ে এরশাদ আওয়ামী লীগের সহযোগিতায় ক্ষমতায় ছিল। এরশাদের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, সেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের শুধু রাজনৈতিক দল নয়—কবি-সাহিত্যিক, পেশাজীবী মানুষ, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিকসহ সমাজের সচেতন সকল মানুষ প্রত্যাশা করেছিল দেশে গণতন্ত্র স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে আবারও নস্যাৎ করা হয়।
তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবোধক। তারপর নবম জাতীয় সংসদে দুঃখজনকভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট রেজিমের সময় ২০১৪ সালের নির্বাচন একতরফাভাবে হয়, যেখানে ১৫২ বা ১৫৩ জন ব্যক্তিকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। ২০১৮ সালে রাতের ভোটে নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে ‘আমি এবং ডামি’র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, ছাত্র-জনতা ও আপামর জনসাধারণের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, শত শত প্রাণের বিনিময়ে ও হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়ার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে আবার নতুন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রাণান্তকর চেষ্টায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
তিনি বলেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল। এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এবং সেই অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে এই মহান জাতীয় সংসদ।