বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়।
বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টায় গাজীপুরের বোর্ডবাজারে বাউবির মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার, গবেষণার প্রসার এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড.আনিসুর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান।
সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও সাতটি স্কুলের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পায়রা অবমুক্তকরণ ও বেলুন উড্ডয়নের মাধ্যমে প্রধান অতিথি মূল অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, চিত্র প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। মূল অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্য ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড.আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও বর্তমান কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাউবির উদ্দেশ্য শুধু সনদ প্রদান নয়, বরং শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এ জন্য গত ৩৪ বছরের অর্জন, শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের অবদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মানোন্নয়ন, পরীক্ষায় অনিয়ম ও নকল প্রতিরোধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কার্যকর ব্যবহার, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিশেষে, বাউবির শিক্ষার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক, মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (আইটিভিইটি)-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে বাউবির বিভিন্ন প্রোগ্রামে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী ৯ জন শিক্ষার্থীকে প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। পাশাপাশি, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের তৃতীয় লিঙ্গের একজন শিক্ষার্থীকে তার কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। পুরস্কার বিতরণ পর্বে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও বাউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি স্কুলের ডিনগণ নিজ নিজ স্কুলের ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নাম ঘোষণা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ৩৪ বছরের পথচলায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম থেকে বর্তমানে ৫৫টি প্রোগ্রাম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এখন শুধু শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধি বা সনদ প্রদানের পরিবর্তে জ্ঞাননির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, দক্ষতাভিত্তিক ও উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইটি-সংক্রান্ত নতুন উদ্যোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রাফিক ডিজাইন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কোরিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে ডিনস কমিটি গঠন, বন্ধ হয়ে যাওয়া জার্নাল পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও ডিজিটাল লার্নিং ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শক্তি হলো জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ, যার মাধ্যমে বয়স নির্বিশেষে মানুষ শিক্ষার আওতায় আসতে পারে। তাই সংখ্যাগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জনমনে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করে একে আধুনিক, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অগ্রণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মুখ্য আলোচক অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। গত ৩৪ বছরে বাউবি কর্মজীবী মানুষ, নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বাউবির শিক্ষাব্যবস্থা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃতি লাভ করেছে।
তিনি শিক্ষার মানোন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি, কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশি-বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে বাউবিকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শ অক্ষুণ্ন রেখে বাউবি সবার কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি একটি দক্ষ, মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন,বাউবির ৩৪ বছরের অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রথম চ্যান্সেলর বেগম খালেদা জিয়ার অবদান গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, বাউবির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে মানসম্মত, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পরিচালনব্যবস্থা আধুনিকায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিব (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম। বাউবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) টি এম আহমেদ হুসেইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। এছাড়াও আলোচনা অনুষ্ঠানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির উপাচার্য, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য ও ট্রেজারার উপস্থিত ছিলেন।
বাউবির ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে নতুনভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬
বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়।
বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ১০টায় গাজীপুরের বোর্ডবাজারে বাউবির মূল ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার, গবেষণার প্রসার এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড.আনিসুর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান।
সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও সাতটি স্কুলের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পায়রা অবমুক্তকরণ ও বেলুন উড্ডয়নের মাধ্যমে প্রধান অতিথি মূল অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, চিত্র প্রদর্শনী ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। মূল অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্য ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড.আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ও বর্তমান কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বাউবির উদ্দেশ্য শুধু সনদ প্রদান নয়, বরং শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এ জন্য গত ৩৪ বছরের অর্জন, শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রে তাদের অবদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মানোন্নয়ন, পরীক্ষায় অনিয়ম ও নকল প্রতিরোধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে কারিগরি ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কার্যকর ব্যবহার, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিশেষে, বাউবির শিক্ষার গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক, মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ ছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (আইটিভিইটি)-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে বাউবির বিভিন্ন প্রোগ্রামে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী ৯ জন শিক্ষার্থীকে প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। পাশাপাশি, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের তৃতীয় লিঙ্গের একজন শিক্ষার্থীকে তার কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। পুরস্কার বিতরণ পর্বে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও বাউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি স্কুলের ডিনগণ নিজ নিজ স্কুলের ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নাম ঘোষণা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ৩৪ বছরের পথচলায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় একটি একাডেমিক প্রোগ্রাম থেকে বর্তমানে ৫৫টি প্রোগ্রাম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এখন শুধু শিক্ষার্থীসংখ্যা বৃদ্ধি বা সনদ প্রদানের পরিবর্তে জ্ঞাননির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, দক্ষতাভিত্তিক ও উদ্ভাবনমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইটি-সংক্রান্ত নতুন উদ্যোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গ্রাফিক ডিজাইন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কোরিয়ান ও জাপানিজ ভাষা শিক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মমুখী শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে ডিনস কমিটি গঠন, বন্ধ হয়ে যাওয়া জার্নাল পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও ডিজিটাল লার্নিং ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম শক্তি হলো জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ, যার মাধ্যমে বয়স নির্বিশেষে মানুষ শিক্ষার আওতায় আসতে পারে। তাই সংখ্যাগত সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। প্রথমবারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তাদের সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জনমনে বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করে একে আধুনিক, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অগ্রণী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মুখ্য আলোচক অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য মানসম্মত ও জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। গত ৩৪ বছরে বাউবি কর্মজীবী মানুষ, নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বাউবির শিক্ষাব্যবস্থা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃতি লাভ করেছে।
তিনি শিক্ষার মানোন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি, কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশি-বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে বাউবিকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিষ্ঠার মূল আদর্শ অক্ষুণ্ন রেখে বাউবি সবার কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি একটি দক্ষ, মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং বাউবির প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন,বাউবির ৩৪ বছরের অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রথম চ্যান্সেলর বেগম খালেদা জিয়ার অবদান গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, বাউবির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে মানসম্মত, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পরিচালনব্যবস্থা আধুনিকায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসিব (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম। বাউবির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) টি এম আহমেদ হুসেইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। এছাড়াও আলোচনা অনুষ্ঠানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির উপাচার্য, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য ও ট্রেজারার উপস্থিত ছিলেন।
বাউবির ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে নতুনভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনব্যাপী শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মতামত