বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার জন্য সৌরশক্তির একটি সাশ্রয়ী এবং দিন-রাত ও বর্ষাকালেও কার্যকর বিকল্প হিসেবে 'পাথরকুচি পাতা' বা PKL (Pathor Kuchi Leaf) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর দক্ষতা, বড় পরিসরে প্রয়োগযোগ্যতা ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গবেষকরা বিদ্যুৎ-সংযোগহীন (অফ-গ্রিড) এলাকায় সহায়তা প্রদান, মোবাইল চার্জিং এবং এলইডি (LED) বাতি জ্বালানোর ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন; তবে ব্যাপক ব্যবহারের জন্য এর আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে PKL বিদ্যুতের গুরুত্ব
১. গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ঘাটতি: বাংলাদেশে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগহীন গ্রামগুলোতে।
২. সৌরশক্তির (SPV) সীমাবদ্ধতা: সৌরশক্তি রাত ও বর্ষাকালে কাজ করে না; এক্ষেত্রে চকখ-এর নিরবচ্ছিন্ন কার্যকারিতা একটি বড় সুবিধা।
৩. স্থানীয় উদ্ভাবন: PKL বিদ্যুৎকে অনেক সময় "বাংলা বিদ্যুৎ" বলা হয়, কারণ এটি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে উদ্ভাবন করেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আলম খান।
প্রযুক্তিগত
সম্ভাবনা
১. শক্তির উৎস: PKL বা পাথরকুচি পাতায় (বৈজ্ঞানিক
নাম: Bryophyllum pinnatum) ম্যালিক,
সাইট্রিক ও আইসো-সাইট্রিকের মতো জৈব অ্যাসিড থাকে, যা ইলেক্ট্রোলাইট বা বিদ্যুৎ-পরিবাহী
মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
২. ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বা তড়িৎ-রাসায়নিক
বিন্যাস: সাধারণত পাথরকুচি পাতার নির্যাস বা রসের সাথে জিঙ্ক (Zn) ও কপার (Cu)-এর ইলেকট্রোড ব্যবহার
করা হয়।
কার্যক্ষমতা:
১. ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য ১ কিলোওয়াট
(kW) ক্ষমতার PKL মাইক্রো-পাওয়ার সিস্টেম
পরীক্ষা করা হয়েছে।
২. সৌরশক্তির বিপরীতে এটি দিন ও রাত উভয়
সময়েই কাজ করে।
৩. এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন, এলইডি বাতি এবং
ছোটখাটো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব।
দক্ষতা: গবেষণায় দেখা গেছে
যে এর শক্তি রূপান্তরের দক্ষতা প্রায় ৬৫% এবং অভ্যন্তরীণ রোধ (internal resistance)
প্রায় ০.৬ ওহম।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: PKL বনাম সোলার পিভি (Solar PV)
|
বৈশিষ্ট্য |
সোলার পিভি |
PKL বিদ্যুৎ |
|
কার্যকারিতা |
শুধুমাত্র
দিনের বেলা |
দিন-রাত
ও সব আবহাওয়ায় |
|
বর্ষাকালে
নির্ভরযোগ্যতা |
কম |
স্থিতিশীল |
|
খরচ |
প্রাথমিক
বিনিয়োগ বেশি |
কম
খরচ, স্থানীয়ভাবে লভ্য |
|
সম্প্রসারণযোগ্যতা
বৈশ্বিকভাবে প্রমাণিত |
উদীয়মান |
ক্ষুদ্র
পরিসর |
|
ব্যবহারের
ক্ষেত্র |
গৃহস্থালি,
শিল্প, গ্রিড |
গ্রামীণ
অফ-গ্রিড এলাকা, মোবাইল চার্জিং |
|
সীমাবদ্ধতা |
সূর্যালোক
ও স্টোরেজ ব্যাটারির প্রয়োজন |
দক্ষতা
ও স্থায়িত্বজনিত সমস্যা |
চ্যালেঞ্জ
ও ঝুঁকি
১. পরীক্ষামূলক পর্যায়: PKL এখনও বাণিজ্যিকভাবে চালু
হয়নি।
২. দক্ষতা সংক্রান্ত উদ্বেগ: সময়ের সাথে
ভোল্টেজ ও কারেন্ট কমে যায়; অভ্যন্তরীণ রোধ (internal
resistance) আদর্শ মানের চেয়ে বেশি।
৩. স্থায়িত্ব: PKL সেলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা
উন্নয়নের প্রয়োজন।
৪. সম্প্রসারণযোগ্যতা: বর্তমান ব্যবস্থাগুলো
ক্ষুদ্র পরিসরের; শিল্পক্ষেত্রে এর ব্যবহার অনিশ্চিত।
ভবিষ্যৎ
সম্ভাবনা
১. গ্রামীণ ক্ষমতায়ন: PKL গ্রামের যোগাযোগ, শিক্ষা
ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
২. হাইব্রিড ব্যবস্থা: সোলারের সাথে PKL -এর সমন্বয় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ
নিশ্চিত করতে পারে।
৩. উপজাত পণ্য: PKL সেল থেকে জিঙ্ক বর্জ্য
(যা সার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য) ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা অর্থনৈতিক মূল্য যোগ
করে।
৪. গবেষণার দিক: দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ
রোধ কমানো এবং কমিউনিটি-স্তরের গ্রিড পর্যন্ত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের
ক্ষেত্রে PKL বিদ্যুৎ একটি সম্ভাবনাময়
উদ্ভাবন; যেখানে সোলার ব্যবস্থা হিমশিম খায়, সেখানে এটি নিরবচ্ছিন্ন ও কম খরচে বিদ্যুৎ
সরবরাহ করতে সক্ষম। তবে, মূলধারার জ্বালানি সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে একে
দক্ষতা ও সম্প্রসারণযোগ্যতা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার জন্য সৌরশক্তির একটি সাশ্রয়ী এবং দিন-রাত ও বর্ষাকালেও কার্যকর বিকল্প হিসেবে 'পাথরকুচি পাতা' বা PKL (Pathor Kuchi Leaf) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর দক্ষতা, বড় পরিসরে প্রয়োগযোগ্যতা ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গবেষকরা বিদ্যুৎ-সংযোগহীন (অফ-গ্রিড) এলাকায় সহায়তা প্রদান, মোবাইল চার্জিং এবং এলইডি (LED) বাতি জ্বালানোর ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন; তবে ব্যাপক ব্যবহারের জন্য এর আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে PKL বিদ্যুতের গুরুত্ব
১. গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের ঘাটতি: বাংলাদেশে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত, বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগহীন গ্রামগুলোতে।
২. সৌরশক্তির (SPV) সীমাবদ্ধতা: সৌরশক্তি রাত ও বর্ষাকালে কাজ করে না; এক্ষেত্রে চকখ-এর নিরবচ্ছিন্ন কার্যকারিতা একটি বড় সুবিধা।
৩. স্থানীয় উদ্ভাবন: PKL বিদ্যুৎকে অনেক সময় "বাংলা বিদ্যুৎ" বলা হয়, কারণ এটি সর্বপ্রথম বাংলাদেশে উদ্ভাবন করেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আলম খান।
প্রযুক্তিগত
সম্ভাবনা
১. শক্তির উৎস: PKL বা পাথরকুচি পাতায় (বৈজ্ঞানিক
নাম: Bryophyllum pinnatum) ম্যালিক,
সাইট্রিক ও আইসো-সাইট্রিকের মতো জৈব অ্যাসিড থাকে, যা ইলেক্ট্রোলাইট বা বিদ্যুৎ-পরিবাহী
মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
২. ইলেক্ট্রোকেমিক্যাল বা তড়িৎ-রাসায়নিক
বিন্যাস: সাধারণত পাথরকুচি পাতার নির্যাস বা রসের সাথে জিঙ্ক (Zn) ও কপার (Cu)-এর ইলেকট্রোড ব্যবহার
করা হয়।
কার্যক্ষমতা:
১. ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য ১ কিলোওয়াট
(kW) ক্ষমতার PKL মাইক্রো-পাওয়ার সিস্টেম
পরীক্ষা করা হয়েছে।
২. সৌরশক্তির বিপরীতে এটি দিন ও রাত উভয়
সময়েই কাজ করে।
৩. এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন, এলইডি বাতি এবং
ছোটখাটো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব।
দক্ষতা: গবেষণায় দেখা গেছে
যে এর শক্তি রূপান্তরের দক্ষতা প্রায় ৬৫% এবং অভ্যন্তরীণ রোধ (internal resistance)
প্রায় ০.৬ ওহম।
তুলনামূলক পর্যালোচনা: PKL বনাম সোলার পিভি (Solar PV)
|
বৈশিষ্ট্য |
সোলার পিভি |
PKL বিদ্যুৎ |
|
কার্যকারিতা |
শুধুমাত্র
দিনের বেলা |
দিন-রাত
ও সব আবহাওয়ায় |
|
বর্ষাকালে
নির্ভরযোগ্যতা |
কম |
স্থিতিশীল |
|
খরচ |
প্রাথমিক
বিনিয়োগ বেশি |
কম
খরচ, স্থানীয়ভাবে লভ্য |
|
সম্প্রসারণযোগ্যতা
বৈশ্বিকভাবে প্রমাণিত |
উদীয়মান |
ক্ষুদ্র
পরিসর |
|
ব্যবহারের
ক্ষেত্র |
গৃহস্থালি,
শিল্প, গ্রিড |
গ্রামীণ
অফ-গ্রিড এলাকা, মোবাইল চার্জিং |
|
সীমাবদ্ধতা |
সূর্যালোক
ও স্টোরেজ ব্যাটারির প্রয়োজন |
দক্ষতা
ও স্থায়িত্বজনিত সমস্যা |
চ্যালেঞ্জ
ও ঝুঁকি
১. পরীক্ষামূলক পর্যায়: PKL এখনও বাণিজ্যিকভাবে চালু
হয়নি।
২. দক্ষতা সংক্রান্ত উদ্বেগ: সময়ের সাথে
ভোল্টেজ ও কারেন্ট কমে যায়; অভ্যন্তরীণ রোধ (internal
resistance) আদর্শ মানের চেয়ে বেশি।
৩. স্থায়িত্ব: PKL সেলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা
উন্নয়নের প্রয়োজন।
৪. সম্প্রসারণযোগ্যতা: বর্তমান ব্যবস্থাগুলো
ক্ষুদ্র পরিসরের; শিল্পক্ষেত্রে এর ব্যবহার অনিশ্চিত।
ভবিষ্যৎ
সম্ভাবনা
১. গ্রামীণ ক্ষমতায়ন: PKL গ্রামের যোগাযোগ, শিক্ষা
ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
২. হাইব্রিড ব্যবস্থা: সোলারের সাথে PKL -এর সমন্বয় ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ
নিশ্চিত করতে পারে।
৩. উপজাত পণ্য: PKL সেল থেকে জিঙ্ক বর্জ্য
(যা সার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য) ও হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা অর্থনৈতিক মূল্য যোগ
করে।
৪. গবেষণার দিক: দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ
রোধ কমানো এবং কমিউনিটি-স্তরের গ্রিড পর্যন্ত সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের
ক্ষেত্রে PKL বিদ্যুৎ একটি সম্ভাবনাময়
উদ্ভাবন; যেখানে সোলার ব্যবস্থা হিমশিম খায়, সেখানে এটি নিরবচ্ছিন্ন ও কম খরচে বিদ্যুৎ
সরবরাহ করতে সক্ষম। তবে, মূলধারার জ্বালানি সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে একে
দক্ষতা ও সম্প্রসারণযোগ্যতা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।

মতামত